চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দে ৩৭ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর রোববার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানানো হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাকে সম্মান জানাতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে ঘোড়ার গাড়িতে করে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
এই ব্যতিক্রমী বিদায় আয়োজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। বিদায় সংবর্ধনা উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্কাউট সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিপুল চন্দ্র দে-কে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং করতালি দিয়ে বরণ করে নেন। প্রাত্যহিক সমাবেশে তাকে সম্মানসূচক স্যালুট প্রদান করা হয় এবং বিদায়ী সংগীত পরিবেশন করা হয়।
এরপর বিদ্যালয় মিলনায়তনে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের স্মৃতিচারণ, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, মানপত্র পাঠ, নাটিকা উপস্থাপন, উত্তরীয় পরিধান এবং উপহার বিতরণের আয়োজন করা হয়। বিপুল চন্দ্র দে ১৯৮৯ সালের ১ আগস্ট করেরহাট কামিনী মজুমদার উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ২২ বছর গণিতের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০১১ সালের ১ অক্টোবর তিনি জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এই বিদ্যালয়ে তিনি প্রায় ১৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালে তাকে বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বিপুল চন্দ্র দে উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তাকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। বিদায়ী শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, শিক্ষকতা তার কাছে কেবল একটি পেশা নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা পরিষদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছেন, তা আজীবন স্মরণ রাখবেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেবল ভালো ফলাফল অর্জন করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা জরুরি। সততা, মানবিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আবুল হাশেম ভূঁইয়া বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক জাতি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিপুল চন্দ্র দে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তার কর্মনিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা আগামী প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল আলম বলেন, বিপুল চন্দ্র দে কেবল একজন দক্ষ শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি বিদ্যালয় পরিবারের একজন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই অবদান বিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে প্রিয় শিক্ষককে এমন রাজকীয় বিদায় জানাতে পেরে উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
