রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার ৫৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসার ১১৪ কাঠা জমি নিয়ে একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি যৌথ উদ্যোগে ১৯ তলা বিশিষ্ট একটি অভিজাত আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবনটি নির্মিত হলে ঢাকা ওয়াসা ৫১ শতাংশ এবং আবাসন প্রতিষ্ঠানটি ৪৯ শতাংশ মালিকানা পাবে।
এই জমিটি বর্তমানে গাছপালা ও খোলামেলা পরিবেশে ঢাকা ওয়াসার ডাকবাংলো ও কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রতি কাঠা প্রায় ১০ কোটি টাকা হিসেবে মোট ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সেখানে প্রায় দেড় শ ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে, যার প্রতিটি ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের হবে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গুলশানের মতো এলাকায় এই ধরনের আইকন ক্যাটাগরির ফ্ল্যাটের দাম বর্গফুটপ্রতি ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সে হিসেবে প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং পুরো প্রকল্পের ফ্ল্যাটের মোট বাজারমূল্য ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভবনটি নির্মাণে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট আবাসন প্রতিষ্ঠান।
ঢাকা ওয়াসার নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৬ জুন এই প্রস্তাবটি জমা দেওয়া হয়। এরপর ১৬ জুলাই ঢাকা ওয়াসা তিন সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটির দায়িত্ব ছিল জমির মালিকানা, বর্তমান ব্যবহার এবং প্রস্তাবের সুবিধা-অসবিধা যাচাই করা। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং ওয়াসার স্বার্থ রক্ষা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত মঙ্গলবার ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি ও নতুন চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন বলে জানা গেছে। ফলে প্রস্তাবটি পাস করা সম্ভব হয়নি। এই জমিটি ১৯৬১ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি গুলশান মডেল টাউন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দিয়েছিল।
২০০৯ সালে রাজউকের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, জমিটি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে জমির ব্যবহার ও হস্তান্তরের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসেনি। তবে বরাদ্দকৃত জমির শর্ত যাতে ভঙ্গ না হয়, সেদিকে নজর রাখা হবে।
এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের খোলামেলা ও সবুজ জমি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের জন্য ব্যবহারের উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আরও বলেন, সরকারি সম্পদ কোনো ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির মাধ্যম হতে পারে না এবং এই উদ্যোগের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করছে তা স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এছাড়া ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তাদের জন্য ৪ হাজার ৭০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি প্রাধিকার অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা এত বড় আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য যোগ্য নন। সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটের আয়তনও সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের মতো। ফলে এত বড় ফ্ল্যাটগুলো ওয়াসা কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
সমালোচকরা বলছেন, যদি ভবন নির্মাণ করতেই হয়, তবে ওয়াসা নিজস্ব অর্থায়নে তা করতে পারে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের প্রয়োজন নেই। এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইনের চেয়ারম্যান মো. শেখ সাদী, যিনি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির মাধ্যমে সংস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে।
গত ২ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. সাব্বির মোস্তফা খানকে ঢাকা ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের পর সংস্থাটির কার্যকারিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারি জমি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের এই উদ্যোগটি এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
