সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং বিচারক নিয়োগের দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার জনস্বার্থে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ও ই-মেইলের মাধ্যমে এই নোটিশ প্রদান করেন।
নোটিশে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে। আইনজীবীরা জানান, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছাড়া তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য মাত্র ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য উদ্ধৃত করে নোটিশে বলা হয়, সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২২০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্য বরাদ্দকৃত ২৫০০ কোটি টাকার চেয়েও কম।
বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের বোঝা নয় বরং কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও জরিমানার মাধ্যমে এটি উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করে থাকে। তবে বিচার বিভাগের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে। গত দুই দশকে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যা বিচারিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বর্তমানে উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৪৫ লাখ ১০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে আইনজীবীদের জন্য চেম্বার, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার ও ডিজিটাল অবকাঠামোর তীব্র ঘাটতি রয়েছে। বিচারপ্রার্থীরাও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার ১২০টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল।
বর্তমানে আপিল বিভাগে মাত্র ৬ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০৩ জন বিচারপতি কর্মরত রয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিটি বিভাগে গড়ে প্রতি বিচারপতির বিপরীতে ৫০০০-এরও বেশি মামলার বোঝা রয়েছে। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন অধস্তন আদালতে বিচারপতির সংখ্যা ২০০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০০-এ উন্নীত করার সুপারিশ করলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বাজেটের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
হাইকোর্ট বিভাগে বাণিজ্যিক মামলা নিষ্পত্তির জন্য মাত্র ২টি বেঞ্চ কার্যকর থাকায় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা মূল্যমানের বাণিজ্যিক বিরোধ বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকছে। এছাড়া আপিল বিভাগে ২০০৯ সালে ১১ জন বিচারপতি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫ জন কর্মরত থাকায় একাধিক বেঞ্চ পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত মামলার মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং আপিল বিভাগে মাত্র ১৮ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে। বিচারিক কর্মকর্তাদের সাধারণ কার্যালয় সরঞ্জামের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয় এবং কাগজ সংকটের কারণে বিচারকাজ মুলতবি রাখার মতো ঘটনাও ঘটছে। আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এই অবহেলা সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৩), ২২, ৯৪ এবং ১১৬ এর ক অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নোটিশে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের জন্য যুক্তিসঙ্গত বাজেট কাঠামো প্রণয়ন, পর্যাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ, বেঞ্চ গঠন এবং বিচার বিভাগের রাজস্ব আয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে জানানোর জন্য বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
