রাজশাহীর পদ্মা নদীতে গত দশ বছরে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নদীটিতে নৌকাডুবি, খেয়া পারাপার এবং গোসল করতে নেমে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলায় অন্তত ৬১টি নৌদুর্ঘটনায় ৭০ থেকে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই ৪০টি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হিসাবের বাইরেও নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় না, ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। গত ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর-চাকলা গ্রামে পদ্মায় ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়।
এর আগে ৩০ জুলাই নৌকাডুবির ঘটনায় বাবা ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, কুষ্টিয়া থেকে বাবার এবং রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মা নদী থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন কাটাখালী থানার শ্যামপুর শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি কাওসার আলী এবং তার তিন বছর বয়সী ছেলে জিয়ারুল হক।
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় ডিঙি নৌকা ডুবে তিনজন নিখোঁজ হন, যাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার না করা এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে চলাচল।
বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের তীব্রতা বেড়ে যায়, যা ছোট নৌকার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাজশাহীর পদ্মাপাড় এখন নগরবাসীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র। এখানে প্রায় ৫০০টি ভ্রমণ নৌকা চলাচল করে। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় আনন্দের এই আয়োজন অনেক সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।
২০২০ সালে শ্রীরামপুর এলাকায় নৌকা ডুবে নববধূসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছিল। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালানো হলেও প্রতিরোধমূলক স্থায়ী উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তারা প্রতিটি ভ্রমণ নৌকায় যাত্রী সংখ্যা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ, ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত মাঝি নিয়োগ এবং নিয়মিত নৌ-পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, অসাবধানতা ও অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা তা ব্যবহার করতে চান না। নদী বিশেষজ্ঞ মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, পদ্মার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করে সেখানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের সাঁতার শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌকার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মাঝি ও ভ্রমণকারীদের সচেতন করতে কাজ চলছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌকার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হচ্ছে এবং লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, নৌদুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং নৌযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, কেবল দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই পদ্মায় প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
