অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার ব্যক্তিগত বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, কিন্তু এর কারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া সমীচীন নয়। তিনি সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এই বক্তব্য প্রদান করেন।
অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আবেগ দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না, বরং এটি আইন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আইন অনুযায়ী একটি কোম্পানি এবং এর মালিক বা ব্যবস্থাপনার পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা। কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাই কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ভার প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, একটি কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে কর্মরত হাজার হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ে। এছাড়া কোম্পানির বিভিন্ন দায়-দেনা থাকে এবং ব্যাংক ঋণের বিষয় থাকে যা পরিশোধ করা প্রয়োজন।
কোম্পানিগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, তাই কোনো কোম্পানি বন্ধ করার আগে এর অর্থনৈতিক প্রভাব এবং স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, কোম্পানি বন্ধ করা কোনোভাবেই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। তবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, কোম্পানিকে আলাদা রাখার অর্থ এই নয় যে দুর্নীতিবাজদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং মামলাগুলো চলমান রয়েছে। ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের কৃতকর্মের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন এবং আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাংক ঋণের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন লঙ্ঘন করে কাউকে কোনো ঋণ সুবিধা দিচ্ছে না। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা মেনেই ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেসব কোম্পানি আইন অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য, কেবল তাদেরই এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনগত বাধা রয়েছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি জানান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার কঠোরভাবে নিয়মকানুন অনুসরণ করছে। দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের অর্থনীতি যখন আইন দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—এই দুটি বিষয়কে সরকার আলাদাভাবেই দেখছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান আইনি লড়াই যেমন অব্যাহত থাকবে, তেমনি দেশের উৎপাদনশীল খাত ও কর্মসংস্থান রক্ষায় কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় থেকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বিশেষের অপরাধের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর খড়গ নেমে এলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তাই আইনগত কাঠামোর মধ্যে থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বারবার আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান যে, দেশের আর্থিক খাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।
