বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ বা এলএ শাখাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালালচক্র, যারা সরকারি প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দাবি করছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই চক্রটি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে সেবাপ্রার্থীদের প্রলুব্ধ করে এবং টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখার ভয় দেখায়।
সরকারি প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের চেক পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই এই দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। শেরপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার শফিকুল ইসলাম জানান, তার ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের চেক পেতে চার মাস ধরে ঘুরছেন। এই সময়ে আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাকে দ্রুত চেক পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৩ শতাংশ টাকা দাবি করেন।
শফিকুল ইসলামের ভাষ্যমতে, ওই ব্যক্তি তাকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাইরে গিয়ে টাকা দেওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে সিসি ক্যামেরার নজরদারি এড়িয়ে লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নন্দীগ্রাম উপজেলার সামছুল আলম। তিনি জানান, ১৭ শতক জমি অধিগ্রহণের পর দুই বছর পার হলেও তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি।
তার অভিযোগ, একই এলাকায় অন্য এক জমির মালিক ৪ শতাংশ হারে ঘুষ দিয়ে দ্রুত টাকা তুলে নিয়েছেন। সামছুল আলমের মতে, দপ্তরে অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় ভুক্তভোগীরা দালালের কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-ঢাকা রেলপথ প্রকল্পের ভুক্তভোগী আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমারের সঙ্গে কাজ করিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তার আলোচনা হয়েছিল।
ক্ষতিপূরণের ১৪ লাখ টাকার বিপরীতে ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। একই প্রকল্পের ভুক্তভোগী বাদশা মিয়ার সঙ্গে মামুন নামের এক ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখা গেছে, যিনি নিজেকে সহায়তাকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ক্ষতিপূরণের ৩ শতাংশ টাকা দাবি করেন। অনুসন্ধানে এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসিম কুমার, অফিস সহকারী নূর ইসলাম এবং কানুনগো মাসুদ রানার নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে।
তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সার্ভেয়ার অসিম কুমার জানান, তিনি কোনো ঘুষের সঙ্গে জড়িত নন এবং বাইরে কেউ তার নাম ব্যবহার করলে তার দায় তিনি নেবেন না। কানুনগো মাসুদ রানা জানান, তিনি আলী হোসেন নামের ওই ব্যক্তিকে চেনেন না এবং উৎকোচ গ্রহণের কোনো ঘটনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন।
অফিস সহকারী নূর ইসলাম জানান, অভিযোগ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না এবং কারো কাছে প্রমাণ থাকলে তা লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এলএ শাখার সামনে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
জেলা প্রশাসক জানান, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ঘুষ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে জনবল বাড়ানো হয়েছে এবং অফিসের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে, সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের সম্পাদক কেজিএম ফারুক জানান, অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, যদি প্রশাসন দাবি করে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া সম্ভব, তবে কেন দীর্ঘদিন ধরে সেবাপ্রার্থীরা দালালের কাছে যাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, দালালরা প্রকাশ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করার সাহস পাচ্ছে কারণ তাদের সঙ্গে অফিসের কারো যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেবল দালাল আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন ফাইল কত দিন ধরে কেন আটকে আছে, তার স্বচ্ছ তথ্য সেবাপ্রার্থীদের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। তানজিজুল ইসলাম স্মরণ নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও রেকর্ড জটিলতার অজুহাতে তার ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে রাখা হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মুনিরা সুলতানা জানান, জমির মালিকানা ও রেকর্ড নিয়ে জটিলতা থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। সব মিলিয়ে, বগুড়ার এলএ শাখায় সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
