মিশরের একটি আদালত জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক সারাহ খলিফাসহ মোট ১২ জনকে মাদক পাচার ও অবৈধভাবে মাদক তৈরির দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। ৩৯ বছর বয়সী সারাহ খলিফা মিশরের টেলিভিশন জগতে অপরাধ ও নিরাপত্তাবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘মিশন ইম্পসিবল’ সঞ্চালনার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি কেবল একজন উপস্থাপকই ছিলেন না, বরং কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন।
আদালতের রায়ে সারাহ খলিফা ছাড়াও আরও ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একই মামলায় আরও ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ৭ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাহ খলিফা ও তার সহযোগীরা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছিলেন। এই চক্রটি বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে কৃত্রিম উপায়ে ক্ষতিকর মাদক তৈরি ও তা বাজারজাত করত।
তদন্তের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে ৭৫০ কেজি থেকে ৩ হাজার কেজির বেশি মাদকদ্রব্য এবং মাদক তৈরির কাঁচামাল জব্দ করে। অভিযানে দুটি অ্যাপার্টমেন্টের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলো মূলত গোপন ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রসিকিউটররা আদালতে ২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে আসামিদের বার্তা, ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছিল। সারাহ খলিফাকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কায়রো থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিচার প্রক্রিয়ার সময় সারাহ খলিফা নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি আদালতে দাবি করেন যে, তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে ছবি তোলার আগে জীবনে কখনো মাদক দেখেননি এবং ধূমপানও করেননি।
তিনি তার পারিবারিক মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে দাবি করেন যে, তার মাদকের টাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে আদালত সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর এই রায় প্রদান করেন। মিশরের আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের প্রাথমিক রায়ের পর দেশের গ্র্যান্ড মুফতির মতামত নেওয়া হয় এবং এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়।
সারাহ খলিফার আইনজীবী জানিয়েছেন যে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। মিশরে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, সন্ত্রাসবাদ, ধর্ষণ ও মারাত্মক মাদক পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিশরে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা করে আসছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মিশরে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় এবং কার্যকর করা হয়।
সারাহ খলিফার এই মামলাটি মিশরের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ তিনি একজন সুপরিচিত তারকা ছিলেন। অপরাধ ও নিরাপত্তাবিষয়ক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করা একজন ব্যক্তি নিজেই কীভাবে এমন একটি অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। প্রসিকিউটররা আদালতে প্রমাণ করেছেন যে, এই চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কাজ ভাগ করে নিয়েছিল।
কেউ কাঁচামাল আমদানির দায়িত্বে ছিল, কেউ সরাসরি ল্যাবরেটরিতে মাদক উৎপাদন করত এবং অন্যরা বিক্রির কাজে লিপ্ত ছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। সারাহ খলিফা বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন এবং তার আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
