কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে শক্তিশালী দেশগুলোর আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে দাভোসে দেওয়া এক ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, মাঝারি শক্তির দেশগুলো যদি সম্মিলিতভাবে কাজ না করে, তবে তারা বড় শক্তির চাপের মুখে পড়তে পারে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী কেবল এই আহ্বানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মুখে কানাডা তার ইউরোপীয় মিত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কানাডা সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ইউরোপকে রুশ আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও কানাডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কানাডা বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ ‘সেইফ’-এও যুক্ত হয়েছে।
তবে বর্তমানে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকির সম্মুখীন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যা আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে কানাডার অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে, কারণ দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ট্রাম্প কানাডাকে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে চান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অন্য কোনো অংশীদারের সঙ্গে কানাডা যাতে বিকল্প বাণিজ্যচুক্তি করতে না পারে, সে জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীরবতাকে একটি বড় ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত কানাডাকে আরও গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রস্তাব দেওয়া। ইউরোপ যদি কানাডাকে বিস্তৃত শুল্কমুক্ত বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তাব দেয়, তবে তা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং চীনের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের একটি বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ইউরোপের এই পদক্ষেপের পথে প্রধান বাধা হিসেবে ভীরুতা, অহংকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক কঠোরতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের চাপের মুখে ইউরোপীয় নেতারা দৃঢ় অবস্থান নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। তবে ইতিহাস বলে, কোনো দেশ চাপের মুখে মাথা নত না করলে ট্রাম্প অনেক সময় পিছিয়ে যান।
এছাড়া ইউরোপকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো একক পরাশক্তি হিসেবে ইউরোপের অবস্থান নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তম হলেও, তাকে কানাডার মতো একই ধরনের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ ১২ দেশের বাণিজ্য জোট ‘সিপিটিপিপি’র সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ সংযোগের কথা জানিয়েছেন।
এই জোট বিশ্বের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এর অগ্রগতি এখনো ধীর। কানাডা তার নিজস্ব পথ বেছে নিয়েছে এবং এখন ইউরোপের উচিত সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়ে একটি শক্তিশালী বিকল্প গড়ে তোলা। মাঝারি শক্তির দেশগুলো যদি একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবেই তারা বড় শক্তির সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
