যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত আরও অন্তত ছয় মাস স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যর্থ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। প্যানেটা, যিনি বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় সিআইএ পরিচালক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ভয়াবহ অচলাবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি মনে করেন, এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মার্কিন প্রশাসনের হাতে বর্তমানে খুব সীমিত বিকল্প রয়েছে। প্যানেটার ভাষ্যমতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই সংঘাত ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি বা সমাধানের ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
মার্কিন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান ড্যান ড্রিসকলের পদত্যাগের পর প্যানেটা এই মন্তব্য করেন। পেন্টাগনের কমান্ড কাঠামোয় অস্থিরতা এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কর্মকর্তাদের মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার পর তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্যানেটা বলেন, পেন্টাগনের বর্তমান অস্থিরতা এমন একটি ধারণার জন্ম দিচ্ছে যে, আসলে দায়িত্বে কেউ নেই।
তিনি আরও বলেন, ইরানসহ অন্যান্য প্রতিপক্ষ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করছে। চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর পক্ষ থেকে আসা হুমকির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অস্থিরতা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে তিনি মনে করেন। প্যানেটার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে তিনটি প্রধান পথ খোলা রয়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধ থেকে সরে এসে ব্যর্থতা স্বীকার করা, যা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন। দ্বিতীয়ত, বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা, যেখানে উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাবে কিন্তু কোনো পক্ষই আলোচনায় বসবে না। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা, যা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পথে ইরানের প্রভাব কমিয়ে আনতে পারে।
প্যানেটা মনে করেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ না করলে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয়লাভ করা কঠিন। তিনি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বিষয়ে বারবার ভুল তথ্য প্রদান করায় প্রেসিডেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অবশ্য এই সংঘাতকে সরাসরি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করতে রাজি হননি এবং এটি কবে শেষ হবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেননি।
প্যানেটা আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এই সংঘাত নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে এবং জনমত জরিপে অধিকাংশ আমেরিকান ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করছেন। তিনি মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, সেনাসদস্যদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পালাবদলের পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
প্যানেটার মতে, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ সহায়তা প্রদানে ব্যর্থতা এবং কমান্ড কাঠামোর বিশৃঙ্খলা মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে, প্রতিরক্ষা বিভাগে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই এবং চলমান পরিবর্তনগুলো সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ। তবে প্যানেটা তার অবস্থানে অটল থেকে বলেছেন, বর্তমান বিপজ্জনক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষদের কাছে দুর্বলতার বার্তা পাঠাচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
