অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের নীতিমালা ও নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এই বিশাল অংকের ঋণ দেশের কৃষি ও পল্লী অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বণ্টন করা হবে।
ঋণ বিতরণের এই পরিকল্পনায় শস্য ও ফসল উৎপাদন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শস্য ও ফসল উৎপাদনের জন্য। এছাড়া সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি খাতের জন্য ২ শতাংশ, মৎস্য খাতের জন্য ১৩ শতাংশ এবং প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ২০ শতাংশ ঋণ বরাদ্দ থাকবে।
প্রাণিসম্পদ খাতের এই বরাদ্দের মধ্যে পোল্ট্রি, ডেইরি এবং গরু মোটাতাজাকরণসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ ঋণ কৃষি উৎপাদন এবং পল্লী অঞ্চলে উৎপাদন ও সেবা খাতসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিতরণ করা হবে। অর্থমন্ত্রী আরও জানান, দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এর অংশ হিসেবে গত ৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে। এছাড়া গত ৬ জুলাই উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার আরও একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে। এই স্কিমগুলোর আওতায় মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।
দেশের মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়নে ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল পরিচালনা করছে। ‘কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। অর্থমন্ত্রী জানান, এই তহবিলের আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন।
এই ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ এবং ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত হতে পারে। গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত শিল্প ও উদ্যোগসমূহকে এই তহবিলের আওতায় ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগে এই তহবিলের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বাড়িয়ে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা। কৃষি ও পল্লী অঞ্চলে সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া তদারকি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের মাঝে এই ঋণ বিতরণ করবে। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো আরও সুসংহত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে এই বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, সরকার কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বদ্ধপরিকর।
এই ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে এই বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসারে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
