সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ব্যাংকটির গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরতের আবেদন গ্রহণ শুরু হয় এবং ছয় দিনে প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।
এসব আবেদনের বিপরীতে গ্রাহকদের মোট চাহিদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদন যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পর সোমবার থেকে গ্রাহকদের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক মূলত পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে।
ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। বিগত সময়ে এই ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন অনিয়ম এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার শরিয়াহভিত্তিক এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া আমানত বিমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যায়ক্রমে আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরতের জন্য একটি বিশেষ স্কিম ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত ২৫ আগস্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন আরোপ করা হবে না।
গ্রাহকরা তাদের জমাকৃত মূল অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ এবং মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলতে পারলেও অর্জিত মুনাফা এই মুহূর্তে উত্তোলন করতে পারবেন না। যদি কোনো গ্রাহক তার আমানতের মূল টাকা তুলে নেন, তবে সেটিকে ওই আমানতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে গ্রাহকের কোনো ঋণ বা দায় থাকলে অর্থ ফেরতের আগে তা আমানত থেকে সমন্বয় করা হবে। তবে যারা এখনই টাকা তুলবেন না এবং হিসাব চালু রাখবেন, তারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। মেয়াদি আমানত নির্ধারিত সময়ের আগে ভাঙলে মূল টাকা পাওয়া গেলেও মুনাফা পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হবে। তিনি গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, টাকা উত্তোলনের সময় শাখাগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় বা বিশৃঙ্খলা এড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের সতর্ক করেছে।
যাদের তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজন নেই, তাদের প্রথম দিনেই ব্যাংকে না গিয়ে পর্যায়ক্রমে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের মতে, বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একই সময়ে শাখায় উপস্থিত হলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই গ্রাহকদের ধৈর্য ধরে পর্যায়ক্রমে অর্থ উত্তোলনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবেদন যাচাই শেষে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তহবিল ব্যবহার করে গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো হবে।
