বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান মামলায় নিয়োজিত মার্কিন আইনি প্রতিষ্ঠান কোজেন অ্যান্ড কন্নরের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৪৫২তম পর্ষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে মামলাটি পরিচালনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইনি প্রতিষ্ঠান বা আইনজীবী নেই।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ উদ্ধারে অভিজ্ঞ এবং সফল কোনো নতুন আইনি প্রতিষ্ঠানকে এই মামলার দায়িত্ব দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং দ্রুতই তা সম্পন্ন হবে।
২০১৬ সালে একটি বড় ধরনের সাইবার হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকেই চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। চুরি হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোর মাধ্যমে পাচার হয়ে গিয়েছিল, যা উদ্ধার করা ছিল অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া।
দীর্ঘ সময় ধরে কোজেন অ্যান্ড কন্নর এই মামলাটি পরিচালনা করে আসছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের আইনি কৌশলে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মামলার গতি বৃদ্ধি এবং অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি অন্যান্য আইনি ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের আইনি প্রতিনিধিত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ওই মামলায় নতুন আইনজীবী হিসেবে কুষ্টিয়ার রাগীব রউফ চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এস আলম গ্রুপ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ ও দখলের অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গ্রুপের ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের সুযোগ নেই। এই আইনি সীমাবদ্ধতা লঙ্ঘন করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি আদালত ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের এই ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অনিয়ম দূর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। রিজার্ভ চুরির মামলার আইনি প্রতিনিধি পরিবর্তন এবং ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার সংক্রান্ত আইনি লড়াই এই সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, নতুন আইনি প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির মামলায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক আদালতে অর্থ উদ্ধারের এই মামলাটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং অর্থ উদ্ধারের জন্য সব ধরনের আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। নতুন আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর মামলার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক আইনি পরামর্শকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সবচেয়ে কার্যকর আইনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা এই মামলার একটি সুরাহা করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
