বাংলাদেশের বাজারে ইসবগুলের ভুসি একটি অত্যন্ত পরিচিত পণ্য, যা মূলত হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ব্যবহৃত হয়। তবে দেশের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন ইসবগুলের ভুসি আমদানি করেছে।
এই বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লাখ ডলার বা প্রায় ১০৮ কোটি টাকা। দেশে বাণিজ্যিকভাবে ইসবগুল উৎপাদন না হওয়ায় পুরো চাহিদার জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ইসবগুল মূলত একটি ভেষজ উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম প্ল্যান্টাগো ওভাটা। বাণিজ্যিকভাবে এটি ব্লন্ড সিলিয়াম নামে পরিচিত।
ফার্সি শব্দ ‘আসব্’ বা ঘোড়া এবং ‘গুল্’ বা কান থেকে ইসবগুল নামের উৎপত্তি হয়েছে, কারণ এর বীজের আকৃতি অনেকটা ঘোড়ার কানের মতো। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও পশ্চিম এশিয়া থেকে এর উৎপত্তি হলেও বর্তমানে ভারত বিশ্বের শীর্ষ ইসবগুল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ। ভারতের গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্য ইসবগুলের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল।
বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয় ভারত। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশটি প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার টন ইসবগুল ভুসি ও বীজ রপ্তানি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, যারা ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ কিনে নেয়। এছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশে ইসবগুলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মসলা বিক্রেতাদের তথ্যমতে, বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ইসবগুল ভুসি গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত আট বছরে ইসবগুলের দাম প্রায় ৮৮ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালের জুনে প্রতি কেজি ইসবগুলের দাম ছিল ৮০০ টাকা, যা ২০২২ সালের শেষে ১ হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছায়।
২০২৪ সালের রোজার সময় এই দাম বেড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৈধ আমদানির পাশাপাশি অবৈধ পথেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইসবগুল দেশে প্রবেশ করে। ইসবগুলের উপকারিতা সম্পর্কে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটু মিয়া জানান, এটি একটি শক্তিশালী প্রিবায়োটিক, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে।
এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ডাইজেস্টিভ বিস্কুট তৈরিতে এবং বস্ত্র ও প্রসাধনী শিল্পেও ইসবগুলের ব্যবহার বাড়ছে। ইসবগুলের বীজ প্রোটিনসমৃদ্ধ গোখাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দেশে ইসবগুল চাষের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা ২০১৯ সাল থেকে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বগুড়া, গাজীপুর, লালমনিরহাট ও ফরিদপুরে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা পাওয়া গেছে।
মাগুরায় অবস্থিত আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম জানান, ইসবগুল একটি স্বল্পমেয়াদি ফসল, যা ১১০ থেকে ১২০ দিনে সংগ্রহ করা যায়। নভেম্বর মাসে বীজ বপন করে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে ফসল পাওয়া সম্ভব। এক বিঘা জমিতে ইসবগুল চাষে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে এবং এখান থেকে প্রায় ১০০ কেজি ফলন পাওয়া সম্ভব।
বীজ বিক্রি করে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করা গেলেও ভুসি তৈরি করতে পারলে এই আয় এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে বড় বাধা হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রের অভাব। রিয়াজুল ইসলাম আরও জানান, দেশে ইসবগুলের বীজ ভাঙিয়ে ভুসি তৈরির উপযোগী প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি নেই।
এই প্রক্রিয়াকরণ জটিল হওয়ায় কৃষকদের এখনো বাণিজ্যিকভাবে চাষের পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে না।
